ধান চাষের উন্নত পদ্ধতি



ভূমিকা


ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য। তাই এর সাথে দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত । ঘন বসতিপূর্ণ এ দেশের জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে, অপরদিকে বাড়িঘর, কলকারখানা, হাট-বাজার, সড়ক-জনপথ স্থাপন এবং নদী ভাঙ্গন ইত্যাদি কারণে আবাদি জমির পরিমাণ প্রতিনিয়ত কমছে। তদুপরি রয়েছে খরা, বন্যা, জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ততা, শৈত্য প্রবাহ ও শিলাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ । এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে বেশি ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য । বাংলাদেশ পৃথিবীর ধান উৎপাদনকারী দেশ গুলোর মধ্যে চতুর্থ হলেও এখানকার হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৪.২ টন। চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এ ফলন হেক্টর প্রতি ৬-৬.৫ টন। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে ধানের ফলন বাড়ানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সনাতন জাতের ধান এবং মান্ধাতার আমলের আবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব। এজন্য প্রয়োজন উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যাপক প্রচলন । বাংলাদেশে ১৯৬৮ সালে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) থেকে প্রথম উফশী জাতের ধান (আইআর ৮) মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদ শুরু হয়। খাটো আকৃতির এ উফশী ধান থেকে প্রতি হেক্টরে ৫-৬ টন (বিঘাপ্রতি ১৮-২১ মণ) ফলন পাওয়া যায়। তখন থেকে উফশী ধান লোকমুখে ইরি ধান নামে পরিচিতি লাভ করে । বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৌসুম ও পরিবেশ উপযোগী উফশী ধানের জাত এবং ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফসল, মাটি, পানি, সার ইত্যাদি বিষয়ক কলা-কৌশল উদ্ভাবন করছে। বর্তমানে ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাত দেশের মোট ধানি জমির শতকরা প্রায় ৮০ ভাগে চাষাবাদ করা হচ্ছে এবং এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ ভাগ । ব্রি ধান এভাবে ইরি ধানের ̄স্থলাভিষিক্ত হয়েছে । আমাদের সৃষ্ট ওয়েব সাইটে ধানের উন্নত জাত ও এদের উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে তথ্য দেয়া আছে । আমরা আশা করি এসব তথ্য প্রয়োগ করে ব্যবহারকারীগণ উপকৃত হবেন:


সংশ্লিষ্ট তথ্য


১. বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য শস্য কি?

• ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য শস্য।

২. বাংলাদেশে ধানের গড় ফলন কত?

• ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ হলেও এখানকার হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৪.২ টন। চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এ ফলন হেক্টর প্রতি ৬-৬.৫ টন।

৩. উফশী ও আধুনিক ধান বলিতে কি বুঝায়?

• যে ধান গাছের সার গ্রহণ ক্ষমতা অধিক এবং ফলন বেশি তাকেই উফশী ধান বলা হয়। উফশী ধানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ধান পেকে গেলেও গাছ সবুজ থাকে। উফশী ধানের প্রয়োজনীয় বিশেষ গুণ, যেমন স্বল্প জীবনকাল এবং রোগবালাই, খরা, লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা ইত্যাদি সহনশীলতা সংযোজিত হয় তখন তাকে আধুনিক ধান বলা হয়। তাই সকল উফশী ধান আধুনিক নয় কিন্তু সকল আধুনিক ধানে উফশী গুণ বিদ্যমান।

৪. বাংলাদেশে কোন কোন মৌসুমে ধান চাষ করা যায়?

• আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের চাষাবাদ হয়।

৫. আউশ মৌসুমে কি কি উফশী ধানের চাষ করা যায়?

• আউশ মৌমুম: এ মৌসুমে বপন ও রোপন দু’ভাবেই ধান আবাদ করা যায়। আউশ ধানের বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হল ১৫-৩০ চৈত্র। বোনা আউশের উফশী জাতগুলো হল বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪২ এবং ব্রি ধান৪৩। রোপা আউশের জাতগুলো হল বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮ এবং ব্রি ধান৫৫।

৬. আমন মৌসুমে কোন ধরনের জাতগুলো চাষ করা যায়?

• রোপা আমন ধানের জাতগুলোর মধ্যে আলোক-সংবেদনশীলতা ও জাত নির্বাচন বিবেচনা করা জরুরী। সুগন্ধি পোলাও ও বিরিয়ানির চালের জন্য বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭ এবং ব্রি ধান৩৮ অন্যতম। অধিক ফলনশীল মাঝারি মোটা থেকে মোটা চালের জন্য বিআর১০, বিআর১১, ব্রি ধান৩০ ও ব্রি ধান৩১ চাষ করতে হবে। আগাম জাত হিসাবে বিআর২৫, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯ ও ব্রি ধান৪৯ এবং বিনাধান৭ অত্যন্ত উপযোগী। বন্যামুক্ত এলাকায় উফশী ব্রি হাইব্রিড ধান৪-এর চাষ করা যেতে পারে। জলমগ্নতা-সহনীয় জাত হিসাবে ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২-এর চাষ করা যেতে পারে। মাঝারি মোটা থেকে লম্বা মোটা চাল এবং নাবি জাত হিসাবে বিআর২২, বিআর২৩ এবং ব্রি ধান৪৬-এর চাষ করা যেতে পারে। চারা ও প্রজনন অবস্থায় ৮-১০ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা-সহনশীল জাত হিসাবে ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, বিনাধান৮ ও বিনাধান১০ সবচেয়ে উপযুক্ত জাত। মোটা চাল এবং জোয়ার-ভাটা পরিবেশের ধান হিসাবে ব্রি ধান৪৪ ছাড় করা হয়েছে।

৭. বোরো মৌসুমে উফশী ধান কোনগুলো?

• বোরো মৌসুমের জাতগুলোতে কোন আলোক-সংবেদনশীলতা নেই। এ মৌসুম শুরু হয় ঠান্ডা ও ছোট দিন দিয়ে, আর ফুল ফোঁটে গরমের শুরুতে এবং বড় দিনে । তাই আলোক-সংবেদনশীল কোন জাত বোরো মৌসুমে আবাদযোগ্য নয়। বোরো মৌসুমে চাষাবাদ উপযোগী আগাম জাতগুলো হল বিআর১, বিআর৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫ এবং ব্রি ধান৫৫। উফশী ও দীর্ঘ জীবনকাল বোরো মৌসুমে চাষযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে বিআর১৪, বিআর১৬, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৯, ব্রি ধান৬০ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান১ অন্যতম।

৮. ব্রি ধান২৮-এর পরিবর্তে আগাম কোন জাতের ধান চাষ করা যায়?

• ব্রি হাইব্রিড ধান২ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩-এর চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়।

৯. ঠান্ডা-সহনীয় ও আগাম জাত কোনটি?

• ব্রি ধান৩৬।

১০. হাওর এলাকার উপযোগী ধানের জাত কোনগুলো?

• বিআর১৭, বিআর১৮ এবং বিআর১৯।

১১. শিলাবৃষ্টি-প্রবণ এলাকার উপযোগী জাত কোনটি?

• বিআর৮ এবং বিআর৯।

১২. লবণাক্ততা-সহনশীল জাত কোনগুলো?

• ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬১, ব্রি ধান৮ এবং বিনাধান১০।

১৩. উফশী ধানের মধ্যে সুগন্ধি ধান কোনটি?

• ব্রি ধান৫০ (বাংলামতি)।

১৪. মধ্যম মানের লবণাক্ততা, খরা এবং ঠান্ডা সহনশীল জাত কোনটি?

•ব্রি ধান৫৫।

১৫. উর্বর জমি ও পানি ঘাটতি নেই এমন সব এলাকার জন্য অধিক ফলনশীল জাত হিসাবে কোন কোন ধানের চাষ করলে বেশি লাভবান হওয়া যাবে?

•ব্রি ধান৫৮ যার জীবনকাল ব্রি ধান২৮ এর চেয়ে ৬-৭ দিন বেশি। এটি নাবি কিন্তু ব্রি ধান২৯ এর চেয়ে ৭-৮ দিন আগে পাঁকে।

ধান চাষের উন্নত পদ্ধতি

বীজ বাছাই


১৬. বীজ বাছাইয়ের জন্য কি কি করনীয়?

•দশ লিটার পরিষ্কার পানিতে ৩৭৫ গ্রাম ইউরিয়া সার মেশাতে হবে। এবার ১০ কেজি বীজ ঐ পানিতে দিয়ে নাড়তে হবে। পুষ্ট বীজ ডুবে নিচে জমা হবে এবং অপুষ্ট ও হালকা বীজ পানির উপরে ভেসে উঠবে। হাত অথবা চালনি দিয়ে ভাসমান বীজগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। ভারী বীজ নিচ থেকে তুলে নিয়ে পরিষ্কার পানিতে ৩-৪ বার ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে। ইউরিয়া মিশানো পানি সার হিসাবে বীজতলায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

১৭. বীজ শোধন ও জাগ দেয়ার পদ্ধতি কি?

• বাছাইকৃত বীজ দাগমুক্ত ও পরিপুষ্ট হলে সাধারনভাবে শোধন না করলেও চলে। তবে শোধনের জন্য ৫২-৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম পানিতে ১৫ মিনিট বীজ ডুবিয়ে রাখলে জীবাণুমুক্ত হয়। বীজ যদি দাগমুক্ত হয় এবং বাকানি আক্রমণের আশঙ্কা থাকে তাহলে কারবেনডাজিম-জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করা যায়। ক্ষেতে ২-৩ গ্রাম ছত্রাকনাশক ১ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে ১ কেজি পরিমান বীজ পানিতে ডুবিয়ে নাড়াচাড়া করে ১২ ঘন্টা রেখে দিতে হবে। এরপর বীজ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। এভাবে শোধনকৃত বীজ বাঁশের টুকরি বা ড্রামে ২/৩ পরত শুকনো খর বিছিয়ে তার উপর বীজের ব্যাগ রাখুন এবং আরও ২/৩ পরত শুকনো খর দিয়ে ভালভাবে চেপে তার উপর ইট বা কোন ভারী জিনিস দিয়ে চাপ দিয়ে রাখুন। এভাবে জাগ দিলে আউশ ও আমন মৌসুমের জন্য ৪৮ ঘন্টা, বোরো মৌসুমে ৭২ ঘন্টার মধ্যে ভাল বীজের অঙ্কুর বের হবে এবং বীজতলায় বপনের উপযুক্ত হবে।

১৮. আদর্শ বীজতলা তৈরীর নিয়ম কি?

•দো-আশ ও এটেল মাটি বীজতলার জন্য ভাল। জমি অনুর্বর হলে প্রতি বর্গমিটারে ২ কেজি হারে জৈব সার মেশানো যেতে পারে। এরপর জমিতে ৫-৬ সেঃমিঃ পানি দিয়ে ২/৩টি চাষ ও মই দিয়ে ৭-১০ দিন রেখে দিতে হবে। আগাছা ও খড় ইত্যাদি পচে গেলে আবার চাষ ও মই দিয়ে কাদা করে জমি তৈরী করতে হবে। এবার জমির দৈর্ঘ বরাবর ১মিঃ চওড়া বেড তৈরী করতে হবে। দু’বেডের মাঝে ২৫-৩০ সেঃমিঃ জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। নির্ধারিত জমির দু’পাশের মাটি দিয়ে বেড তৈরী করতে হবে। এরপর উপরের মাটি ভালভাবে সমান করে ৩/৪ ঘন্টা পর বীজ বোনা উচিত।

১৯. বীজতলায় বীজ বপনের আদর্শ পদ্বতি কি?

• প্রতি বর্গমিটার বেডে ৮০-১০০ গ্রাম বীজ বোনা দরকার। বপনের সময় থেকে ৪/৫ দিন পাহাড়া দিয়ে পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং নালা ভর্তি পানি রাখতে হবে।

২০. অতিরিক্ত ঠান্ডায় বীজতলায় কি যত্ন নিতে হবে?

•শৈত্য প্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে দিলে, বীজতলার পানি সকালে বের করে দিয়ে আবার নতুন পানি দিলে, প্রতিদিন সকালে চারার উপর জমাকৃত শিশির ঝরিয়ে দিলে ধানের চারা ঠান্ডার প্রকোপ থেকে রক্ষা পায়।

২১. বীজতলায় কি ধরনের সাধারণ পরিচর্যা প্রয়োজন ?

• বীজতলায় সব সময় নালা ভর্তি পানি রাখা উচিত। বীজ গজানোর ৪-৫ দিন পর বেডের উপর ২-৩ সেঃমিঃ পানি রাখলে আগাছা ও পাখির আক্রমন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

২২. চারা উঠানোর সময় বা বহন করার সময় কি সতর্কতা মানতে হবে ?

• বীজতলায় বেশি করে পানি দিয়ে বেডের মাটি নরম করে নিতে হবে যাতে চারা উঠানোর সময় শিকড় বা কান্ড মুচড়ে বা ভেঙে না যায়। বস্তাবন্দী করে ধানের চারা কোনক্রমেই বহন করা উচিত নয়।

২৩. জমি তৈরীর উত্তম পদ্বতি কি?

•মাটির প্রকারভেদে ৩-৫ বার চাষ ও মই দিলেই জমি তৈরী হয়ে মাটি থকথকে কাদাময় হয়। জমি উঁচুঁনিচু থাকলে মই ও কোদাল দিয়ে সমান করে নিতে হবে।

২৪. ধানের চারা রোপনের উত্তম পদ্বতি কি ও চারার বয়স কত হলে ভাল হয়?

•আউশে ২০-২৫ দিনের, রোপা আমনে ২৫-৩০ দিনের এবং বোরোতে ৩৫-৪৫ দিনের চারা রোপন করা উচিত। এক হেক্টর জমিতে ৮-১০ কেজি বীজের চারা লাগে। প্রতি গুছিতে ১টি সতেজ চারা রোপন করাই যথেষ্ট। তবে চারার বয়স একটু বেশি হলে প্রতি গুছিতে ২-৩টি চারা রোপন করা যেতে পারে। সারিতে চারা রোপন করার সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২০-২৫ সেঃমিঃ এবং প্রতি গুছির দূরত্ব ১৫-২০ সেঃমিঃ হওয়াই উত্তম।

২৫. ধান চাষে দ্বি-রোপন পদ্বতি কি?

•জলাবদ্ধতা পূর্ববর্তী ফসলের কর্তণ বিলম্বিত হলে বা অন্য কোন কারণে যদি রোপনের জন্য নির্ধারিত জমিতে রোপন বিলম্বিত হয় তবে বেশি বয়সের চারা ব্যবহারের পরিবর্তে দ্বি-রোপন পদ্বতিতে ধান রোপন একটি ভাল প্রযুক্তি। এ পদ্বতিতে ধানের চারা বীজতলা হতে উত্তোলন করে অন্য জমিতে ঘন করে ১০-১০ সেঃমিঃ দূরত্বে সাময়িকভাবে রোপন করা হয়, আমন মৌসুমে ২৫-৩০ দিন পর এবং বোরো মৌসুমে ৩০-৪০ দিন পর আবার উত্তোলন করে মূল জমিতে ২০-২০ সেঃমিঃ দূরত্বে দ্বি-রোপন করা হয়।

ধান চাষে সার ব্যবস্থাপনা


২৬. ধান চাষে সার প্রয়োগের নিয়মাবলী কি?

• ধান গাছের বাড়-বাড়তির বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন মাত্রায় নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। প্রথম দিকের কুশি গজানোর সময় ইউরিয়া সার প্রয়োগ করলে তা থেকে গাছ প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন গ্রহণ করে কার্যকরী কুশির সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। সর্বোচ্চ কুশি উৎপাদন থেকে কাইচথোর আসা অবধি গাছ প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন পেলে প্রতি ছড়ায় পুষ্ট ধানের সংখ্যা বাড়ে। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার যেমন টিএসপি, মিউরেট অব পটাশ, জিপসাম, জিংক সালফেট মাত্রানুযায়ী জমি তৈরীর শেষ পর্যায়ে ছিটিয়ে প্রয়োগ করে চাষ দিয়ে মাটির সাথে ভাল করে মিশিয়ে দিতে হবে। তবে বেলে মাটিতে পটাশ সার দু’কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। তিন ভাগের দুই ভাগ জমি তৈরীর শেষ চাষের সময় এবং এক-তৃতীয়াংশ কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন আগে প্রয়োগ করতে হবে। জৈব সার ব্যবহার করা সম্ভব হলে তা প্রথম চাষের সময়ই জমিতে সমভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জৈব সার খরিফ মৌসুমে ব্যবহার করাই শ্রেয়।

২৭. গন্ধক ও দস্তা সার কখন প্রয়োগ করা ভাল?

• ইউরিয়া সার প্রয়োগ করার পরও ধান গাছ যদি হলদে থাকে এবং বাড়-বাড়তি কম হয় তাহলে গন্ধকের অভাব হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। সেক্ষেত্রে তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ হিসাবে জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। অত:পর বিঘা প্রতি ৮ কেজি জিপসাম সার উপরিপ্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

২৮. ইউরিয়া সার ব্যবস্হাপনায় এলসিসি ব্যবহারের উপকারীতা কি?

• লিফ কালার চার্ট বা এলসিসি প্লাস্টিকের তৈরী চার রং-বিশিষ্ট একটি স্কেল। এলসিসি পদ্বতি অবলম্বন করলে ধান গাছের চাহিদানুযায়ী ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা যায়। ফলে ইউরিয়া সারের খরচ কমানো ও অপচয় রোধ করা যায় এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। পরীক্ষামূলকভাবে দেখা গেছে, এলসিসি ব্যবহারে শতকরা ২০-২৫ ভাগ ইউরিয়া সাশ্রয় করা যায়।

২৯. গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে কি উপকার পাওয়া যায়?

• গুটি ইউরিয়া হল, ইউরিয়া সার দিয়ে তৈরী বড় আকারের গুটি যা দেখতে ন্যাপথালিন ট্যাবলেটের মত। গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে সারের কার্যকারিতা শতকরা ২০-২৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়। ফলে ইউরিয়া সার পরিমানে কম লাগে। আবার গুটি ইউরিয়া জমিতে একবারই প্রয়োগ করতে হয়। এরপর সব সময় গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেন সরবরাহ থাকায় গাছের কোন সুপ্ত ক্ষুধা থাকে না। গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের পূর্ব শর্ত হল, ধান রোপন করতে হবে সারিবদ্ধভাবে। সারি থেকে সারি এবং গোছা থকে গোছার দূরত্ব হবে ২০ সেঃমিঃ। বোরো মৌসুমে চারা রোপনের ১০-১৫ দিন এবং আউশ ও আমন মৌসুমে চারা রোপনের ৭-১০ দিনের মধ্যে প্রতি ৪ গোছার মাঝখানে ৩-৪ ইঞ্চি কাদার গভীরে গুটি পুঁতে দিতে হবে।

৩০. অঞ্চল-ভিত্তিক পরিমিত সার প্রয়োগের উপায় কি?

• কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-ভিত্তিক (৩০টি) থানা নির্দেশিকায় উল্লেখিত নিয়মানুযায়ী সার-এর পরিমান ও নির্দেশণা অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।

ধান চাষে আগাছা ব্যবস্থাপনা


৩১. আগাছা কি?

• আগাছা ফসলের একটি মারাত্মক শত্রু। আগাছা ফসলের ক্ষেতে অনাকাঙ্কিত উদ্ভিদ যেমন শ্যামা, চেঁচড়া, হলদে মুথা ইত্যাদি। যে উদ্ভিদ ভুল জায়গায় জন্মেছে যেমন ধান ক্ষেতে পাট গাছ। আগাছা ধান গাছের আলো, পানি ও খাদ্য উপাদানের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং ফসলের ক্ষতি করে।

৩২. আগাছা কত প্রকার হতে পারে?

• জীবনকালের ভিত্তিতে: বর্ষজীবী (শ্যামা, বথুয়া), দ্বি-বর্ষজীবী (বন্য গাজর) এবং বহুবর্ষজীবী (দূর্বা, ভেদাইল)। পাতা ও কান্ডের আকৃতির ভিত্তিতে: ঘাস-জাতীয় (শ্যামা, ক্ষুদে শ্যামা, দূর্বা, আরাইল, গৈচা, ফুলকা ঘাস, মনা ঘাস, ঝরা ধান), সেজ(Sedge)(হলদে মুথা, বড় চুচা, চেঁচড়া, জয়না, পানি সেজ) ও চওড়া পাতা-জাতীয় (পানি কচু, শুসনি শাক, ঝিল মরিচ, পানি লং, পানি ডোগা, চাঁদমালা, হেলেঞ্চা, ঘেঁচু, বড় পানা, ক্ষুদে পানা ও কচুরি পানা)।

৩৩. আগাছা দমনের পদ্বতি কি?

• (ক)হাত বাছাই, (খ)রাইচ উইডার ও (গ)আগাছানাশক-এর যে কোন পদ্বতি ব্যবহার করে আগাছা দমন করা যায়। তবে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মীদের সাথে পরামর্শক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নিতে হবে।

৩৪. আগাছানাশক ব্যবহারে কি কি সতর্কতা মানতে হবে?

•(ক)সঠিক আগাছানাশক নির্বাচন, (খ)সঠিক মাত্রায় আগাছানাশক প্রয়োগ, (গ)সঠিক সময়ে আগাছানাশক প্রয়োগ, (ঘ)সঠিক প্রয়োগ পদ্বতির অনুসরন, (ঙ)সঠিক পানি ব্যবস্হাপনার অনুসরণ, (চ)আগাছানাশকের বোতলে সঠিক নির্দেশণা পালন এবং (ছ)স্থানীয় কৃষি কর্মীদের পরামর্শ মেনে চলা।

৩৫. আগাছানাশকের ব্যবহারের সঠিক সময় কোনটি?

• (ক)আগাছানাশকের কার্যকারিতা পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। (খ)প্রয়োগের সময়-ভিত্তিক আগাছানাশক ভিন্ন ভিন্ন: (১) “গজানোর পূর্বে” (Pre-emergence), আগাছা গজানোর পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে, (২) “গজানোর পরে” (Post-emergence), আগাছা জন্মানোর পর প্রয়োগ করতে হবে, (৩) “গজানোর পর পর” (Early post-emergence, আগাছা জন্মানোর পর পরই প্রয়োগ করতে হবে এবং (৪) সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরবরাহকৃত আগাছানাশকের বোতল/প্যাকেটের গায়ে লেখা নির্দেশাবলী ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা সর্বদা মেনে চলতে হবে।

ধান চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা


৩৬. ধান চাষে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার কিভাবে নিশ্চিত করা যায়?

• ধান চাষে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধানের জমিতে সব সময় দাঁড়ানো পানি রাখার প্রয়োজন নেই। ধানের চারা রোপনের পর জমিতে ১০-১২ দিন পর্যন্ত ছিপছিপে পানি রাখতে হবে যাতে রোপণকৃত চারায় সহজে নতুন শিকড় গজাতে পারে। এরপর কম পানি রাখলেও চলবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ধানগাছ যেন খরা কবলিত না হয়। বৃষ্টি-নির্ভর রোপা আমন এলাকায় জমির আইল ১৫ সেঃমিঃ উঁচু রাখলে অনেকাংশে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায় যা খরা থেকে ফসলকে কিছুটা হলেও রক্ষা করে। এরপরও যদি ধান ফসল খরা কবলিত হয় তাহলে প্রয়োজন মাফিক সম্পূরক সেচ দিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, খরা কবলিত ধানের চেয়ে সম্পূরক সেচযুক্ত ধানের ফলন হেক্টরে প্রায় ১ টন বেশি হয়।

৩৭. সেচের পানির অপচয় রোধের উপায় কি?

• বোরো মৌসুমে ধানের জমিতে সাধারনত মাটির নালা দিয়ে সেচ দেয়া হয়। ফলে ফসলের জমি ও সেচের পানি উভয়েরই অপচয় হয়। এ অপচয় রোধকল্পে পিভিসি অথবা প্লাস্টিক পাইপ ব্যবহার করে পানির অপব্যবহার ও অপচয় রোধ করা যায়। এ পদ্বতিতে সেচ দিলে পানির অপচয় কমানোর সাথে সেচের খরচও কমানো যায়। গভীর/অগভীর নলকূপ থেকে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেচ দিলে একই পরিমান পানি দিয়ে কাঁচা নালার তুলনায় শতকরা প্রায় ৪০-৪২ ভাগ বেশি জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব। বোরো মৌসুমে ধান আবাদে পানি সাশ্রয়ী আর একটি পদ্বতির নাম অলটারনেট ওয়েটিং এন্ড ড্রাইং (AWD)। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানো পদ্বতিতে সেচ চলবে জাত ভেদে ৪০-৫০ দিন পর্যন্ত। যখনই গাছে থোড় দেখা দেবে তখন থেকে দানা শক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ক্ষেতে স্বাভাবিক ২-৫ সেঃমিঃ পানি রাখতে হবে। এই পদ্বতি ব্যবহারের ফলে সেচের পানি, জ্বালানি ও সময় সাশ্রয় হয় এবং উৎপাদন খরচও হ্রাস পায়।

ধান চাষে অনিষ্টকারী পোকা ও মেরুদন্ডী প্রানী ব্যবস্থাপনা


৩৮. অনিষ্টকারী পোকা ও মেরুদন্ডী প্রানী নিয়ন্ত্রণের উপায় কি?

নিবিড় চাষাবাদের কারণে ফসলে পোকার প্রাদুর্ভাব ও আক্রমণ বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন পোকার প্রাদুর্ভাব বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের উপায়সমূহ একে একে নিম্নে বর্ননা করা হলঃ

*(১)মাজরা পোকা (Stem borer):

মাজরা পোকার আক্রমণ ফুল ফোঁটার আগে হলে মরা ডিগ এবং ফুল ফোঁটার পরে হলে সাদা শিষ বের হয়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলুন।

• আলোক-ফাঁদের সাহায্যে পোকা (মথ) সংগ্রহ করে দমন করুন।

• ধান ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্য নিন।

• পরজীবী (বন্ধু) পোকা মাজরা পোকার ডিম নষ্ট করে ফেলে। সুতরাং যথাসম্ভব কীটনাশক প্রয়োগ বিলম্বিত করুন।

• জমিতে শতকরা ১০-১৫ ভাগ মরা ডিগ অথবা শতকরা ৫ ভাগ সাদা শিষ দেখা দিলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন। আমন ধান কাটার পর চাষ দিয়ে নাড়া মাটিতে মিশিয়ে বা পুড়িয়ে ফেলুন।

*(২)নলমাছি বা গলমাচি (Gall midge):

এই মাছির কীড়া ধানগাছের বাড়ন্ত কুশিতে আক্রমণ করে এবং আক্রান্ত কুশি পেঁয়াজ পাতার মত হয়ে যায়। ফলে কুশিতে আর শিষ হয় না।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• রোপনের পর নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করুন।

• আলোক-ফাঁদ ব্যবহার করে পূর্ণবয়স্ক পোকা দমন করুন।

• জমিতে শতকরা ৫ ভাগ পেয়াজ পাতার লক্ষণ দেখা গেলে কীটনাশক ব্যবহার করুন।

*(৩) পামরি পোকা (Rice hispa):

পামরি পোকার কীড়া পাতার ভেতরে সুড়ঙ্গ করে সবুজ অংশ খায়, আর পূর্ণবয়স্ক পোকা পাতার সবুজ অংশ কুরে কুরে খায়। এভাবে খাওয়ার ফলে পাতা সাদা দেখায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• হাতজাল বা মশারির কাপড় দিয়ে পোকা ধরে মেরে ফেলুন।

• জমিতে শতকরা ৩৫ ভাগ পাতার ক্ষতি হলে অথবা প্রতি গোছায় চারটি পূর্ণ বয়স্ক পোকা অথবা প্রতি কুশিতে ৫টি কীড়া থাকলে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(৪) পাতা মোড়ানো পোকা (Leaf roller):

পাতা মোড়ানো পোকার কীড়া গাছের পাতা লম্বালম্বিভাবে মুড়িয়ে পাতার ভিতরের সবুজ অংশ খায়। খুব বেশি ক্ষতি করলে পাতা পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• আলোক-ফাঁদের সাহায্যে পোকা বা মথ দমন করুন।

• ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির বসার ব্যবস্থা নিন।

• গাছে থোড় আসার সময় বা ঠিক তার আগে যদি শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(৫) চুঙ্গি পোকা (Rice caseworm):

চুঙ্গি পোকা পাতার উপরের অংশ কেটে ছোট ছোট চুঙ্গি তৈরি করে ভেতরে থাকে। আক্রান্ত ক্ষেতে গাছের পাতা সাদা দেখায় এবং পাতার উপরের অংশ কাটা থাকে। দিনের চুঙ্গিগুলো পানিতে ভাসতে থাকে।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• আলোক-ফাঁদের সাহায্যে পোকা বা মথ দমন করুন।

• পানি থেকে হাতজাল দিয়ে চুঙ্গিসহ কীড়া সংগ্রহ করে ধ্বংস করুন।

• জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(৬) লেদা পোকা (Swarming caterpillar):

এ পোকার কীড়া পাতার পাশ থেকে কেটে এমনভাবে খায় যে কেবল ধানগাছের কান্ড অবশিষ্ট থাকে। সাধারনত: শুকনো জমিতে এ পোকার আক্রমণের আশঙ্কা বেশি।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• ধান কাটার পর জমি চাষ দিয়ে রাখুন অথবা নাড়া পুড়িয়ে ফেলুন।

• আলোক-ফাঁদের সাহায্যে পোকা বা মথ দমন করুন।

• ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির বসার ব্যবস্থা নিন।

• জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(৭) ঘাসফড়িং (Grasshopper):

ঘাসফড়িং পাতার পাশ থেকে শিরা পর্যন্ত খায়। জমিতে অধিক সংখ্যায় আক্রমণ করলে এদেরকে পঙ্গপাল বলা হয়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• হাতজাল বা মশারির কাপড় দিয়ে পোকা ধরে মেরে ফেলুন।

• ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির বসার ব্যবস্থা নিন।

• জমির শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(৮) লম্বাশুড় উরচুঙ্গা (Long-horned cricket):

এ পোকা ধানের পাতা এমনভাবে খায় যে পাতার কিনারা ও শিরা বাকি থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত পাতা ঝাঁঝরা হয়ে যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির বসার ব্যবস্থা নিন।

• আলোক-ফাঁদের সাহায্যে পূর্ণবয়স্ক উরচুঙ্গা দমন করুন।

• জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(৯) সবুজ পাতাফড়িং (Green leafhopper):

সবুজ পাতাফড়িং ধানের পাতার রস শুষে খায়। ফলে গাছের বৃদ্ধি কমে যায় ও গাছ খাটো হয়ে যায়। এ পোকা টুংরো ভাইরাস রোগ ছড়িয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• আলোক-ফাঁদের সাহায্যে পোকা দমন করুন।

• হাতজালের প্রতি টানে যদি একটি সবুজ পাতাফড়িং পাওয়া যায় এবং আশেপাশে টুংরো রোগাক্রান্ত ধান গাছ থাকে তাহলে বীজতলায় বা জমিতে কীটণাশক প্রয়োগ করুন।

*(১০) বাদামি গাছফড়িং (Brown planthopper):

বাদামি গাছফড়িং ধানগাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়। ফলে গাছ পুড়ে যাওয়ার রং ধারন করে মরে যায় তখন একে বলা হয় “হপার বার্ন” বা “ফড়িং পোড়া”।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• বোরো মৌসুমে ফেব্রুয়ারি এবং আমন মৌসুমে অগাস্ট মাস থেকে নিয়মিত ধান গাছের গোড়ায় পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন। এ সময় ডিম পাড়তে আসা লম্বা পাখাবিশিষ্ট ফড়িং আলোক-ফাঁদের সাহায্যে দমন করুন। ধানের চারা ঘন করে না লাগিয়ে পাতলা করে রোপন করলে গাছ প্রচুর আলো বাতাস পায়; ফলে পোকার বংশ বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটে।

• পরিমিত ইউরিয়া সার ব্যবহার করুন।

• ধান গাছের গোড়ায় পোকা দেখা গেলে ক্ষেতে জমে থাকা পানি সরিয়ে জমি কয়েকদিন শুকিয়ে নিন।

• স্বল্প জীবনকালের ধানের জাত চাষ করলে এ পোকার আক্রমণ এড়ানো যায়।

• জমির অধিকাংশ গাছে ৪টি ডিমওয়ালা (পেট মোটা) পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা বা ১০টি বাচ্চা বাদামি গাছফড়িং বা উভয়ই দেখা গেলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

• বাদামি গাছফড়িং-এর আক্রমণ শুরু হলে গ্রামের সবাইকে মিলিতভাবে এ পোকা দমনের জন্য জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। অন্যথায় এ পোকা বংশ বিস্তার করে এলাকার সব ধান ক্ষেত ধ্বংস করে দিতে পারে।

*(১১) সাদা-পিঠ গাছফড়িং (White-backed plant hopper):

বাদামি গাছফড়িং-এর মত সাদা-পিঠ গাছফড়িং ধান গাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়। এ পোকার আক্রমণে হপার বার্ন হয়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• বাদামি গাছফড়িং-এর মত এ পোকা দমনের একই ব্যবস্থা নিন।

*(১২) ছাতরা পোকা (Mealy bug):

শুকনো আবহাওয়ায় বা খরার সময় ছাতরা পোকার আক্রমণ বেশি হয়। এ পোকা গাছের কান্ড ও পাতার খোলের মধ্যবর্তী স্থানে অনেক সংখ্যক থাকে, আক্রান্ত স্থানে সাদা মোমের মত পদার্থ দেখা যায়। আক্রমণ তীব্র হলে গাছের শিষ বের হয় না।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• আক্রান্ত গাছ উপড়িয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলুন।

• শুধু আক্রান্ত জায়গায় কীটনাশক প্রয়োগ করে এ পোকা দমন করা যায়।

*(১৩) থ্রিপস (Thrips):

ধানের চারা এবং রোপনের পর কুশি অবস্হায় এ পোকার আক্রমণ দেখা যায়। থ্রিপস পাতায় ক্ষত সৃষ্টি করে রস শুষে খায়। ফলে পাতা লম্বালম্বিভাবে মুড়ে যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• বীজতলায়/জমিতে পানি দিয়ে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করুন।

• অক্রমণ বেশি হলে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(১৪) গান্ধি পোকা (Rice bug):

গান্ধি পোকা ধানের দানায় দুধ সৃষ্টির সময় আক্রমণ করে। বয়স্ক গান্ধি পোকার গা থেকে বিশ্রী গন্ধ বের হয় এবং ক্ষেতে গেলেই তা বোঝা যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• আলোক-ফাঁদের সাহায্যে পোকা দমন করুন।

• গড়ে প্রতি ২-৩টি গোছায় একটি গান্ধি পোকা দেখা গেলে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

• কীটনাশক বিকেল বেলায় প্রয়োগ করতে হবে।।

*(১৫) শিষ-কাটা লেদা পোকা (Ear-cutting caterpillar)

এ পোকার কীড়া পাতার পাশ থেকে কেটে খায় এবং শিষের গোড়া কেটে দেয়। কীড়াগুলো রাতে ধান ক্ষেতে অক্রমণ করে।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• নাড়া পুড়িয়ে ফেলুন।

• ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির বসার ব্যবস্থা নিন।

• জমিতে সেচ প্রদান করে কীড়া দমন করা যায়।

*(১৬) ইঁদুর দমন (Rat control):

ইঁদুর ধান গাছের কুশি কেটে দেয়। ধান পাকলে ধানের ছড়া কেটে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ করে জমা রাখে।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• জমির আইল ও সেচ নিষ্কাশন নালা কম সংখ্যক ও চিকন রাখতে হবে।

• একটি এলাকায় যথাসম্ভব একই সময় ধান রোপন ও কর্তন করা যায় এমনভাবে চাষ করতে হবে।

• ফাঁদ পেতে ইঁদুর দমন করুন।

• বিষটোপ, যেমন-ব্রমাডিওলন দিয়ে ইঁদুর দমন করা যায়।

ধানের রোগ ব্যবস্থাপনা


৩৯। ধানের রোগ-বালাই নিয়ন্ত্রণের উপায় কি?

নিবিড় চাষাবাদের কারণে ধান ফসলে বিভিন্ন প্রকার রোগ-বালাই-এর প্রাদুর্ভাব ও আক্রমণ বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন রোগ-বালাই ধানের ক্ষতি করে এবং ফলন কমিয়ে দেয়। এ জন্য রোগ শনাক্ত করে তার জন্য ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। বাংলাদেশে মোট ৩২টি শনাক্তকৃত রোগের মধ্যে ১০টি প্রধান। এখানে পর্যায়ক্রমে ধানের বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বন্ধ বা নিয়ন্ত্রনের জন্য ১০টি প্রধান রোগ শনাক্তকরন এবং তার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আলোচনা করা হলঃ

*(১) টুংরো (Tungro):

টুংরো ভাইরাসজনিত রোগ। সবুজ পাতাফড়িং এ রোগের বাহক। চারা অবস্থা থেকে গাছে ফুল ফোটা পর্যন্ত সময়ে এ রোগ দেখা দিতে পারে। ধানের ক্ষেতে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় গাছের পাতা হলুদ বা কমলা রঙ ধারন করে। অনেক ক্ষেত্রে সালফার বা নাইট্রোজেন সারের ঘাটতিজনিত কারণে এবং ঠান্ডার প্রকোপে এরূপ হতে পারে। সেক্ষেত্রে সমস্ত জমির ধান বিক্ষিপ্তভাবে না হয়ে সমভাবে হলুদাভ বা কমলা রঙ ধারন করে। গাছের বাড়-বাড়তি ও কুশি কমে যায় ফলে আক্রান্ত গাছ সুস্থ গাছের তুলনায় খাটো হয়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• রোগের প্রাথমিক অবস্থায় রোগাক্রান্ত গাছ তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলুন।

• আগাম বীজতলায় বিশেষ করে আমন ধান কাটার সময়, বোরোর বীজতলায় সবুজ পাতাফড়িং দেখা গেলে হাতজাল বা কীটনাশক প্রয়োগ করে দমনের ব্যবস্থা নিন।

• নিবিড় ধান চাষ এলাকায় ভলান্টিয়ার রাইস/রেটুন ধান তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলুন অথবা জমিতে চাষ দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিন।

• আলোক-ফাঁদ ব্যবহার করে বাহক পোকা সবুজ পাতাফড়িং মেরে ফেলুন।

• সবুজ পাতাফড়িং দমনে কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

*(২) ব্যাকটেরিয়াজনিত পোড়া (Bacterial blight):

চারা রোপনের ১৫-২০ দিনের মধ্যে এবং বয়স্ক ধান গাছে এ রোগ দেখা যায়। আক্রান্ত চারা গাছের গোড়া পচে যায়, পাতা নেতিয়ে পড়ে হলুদাভ হয়ে মারা যায়। এ অবস্থাকে কৃসেক বলে। রোগাক্রান্ত কান্ডের গোড়ায় চাপ দিলে আঠালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হয়। বয়স্ক গাছে সাধারণত থোড় অবস্থা থেকে পাতাপোড়া লক্ষণ দেখা যায়। প্রথমে পাতার অগ্রভাগ থেকে কিনারা বরাবর আক্রান্ত হয়ে নিচের দিকে বাড়তে থাকে। আক্রান্ত অংশ প্রথমে জলছাপ এবং পরে হলুদাভ হয়ে খড়ের রং ধারন করে। ক্রমশ সম্পূর্ণ পাতাটাই শুকিয়ে মরে যায়। অতি মাত্রায় ইউরিয়া সারের ব্যবহার, শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়া এ রোগ বিস্তারে সাহায্য করে।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করুন।

• রোগ দেখা দিলে প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করুন।

• ঝড়-বৃষ্টি এবং রোগ দেখা দেওয়ার পর ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সাময়িক বন্ধ রাখুন।

• কৃসেক হলে আক্রান্ত জমির পানি শুকিয়ে ৭-১০ দিন পর আবার সেচ দিন।

• রোগাক্রান্ত জমির ফসল কাটার পর নাড়া পুড়িয়ে ফেলুন।

*(৩) উফরা (Ufra):

উফরা ধানের কৃমিজনিত রোগ। কৃমি ধানগাছের কচি পাতা ও খোলের সংযোগস্থলে আক্রমন করে। কৃমি গাছের রস শোষণ করায় প্রথমে পাতার গোড়ায় ছিটে-ফোঁটা সাদা দাগ দেখা যায়। ক্রমাণ্বয়ে সে দাগ বাদামি রঙের হয়ে পুরো আগাটাই শুকিয়ে মরে যায়। আক্রমণের প্রকোপ বেশি হলে গাছে বাড়-বাড়তি কমে যায়। থোড় অবস্থায় আক্রমণ করলে থোড়ের মধ্যে শিষ মোচড়ানো অবস্থায় থেকে যায়। ফলে শিষ বের হতে পারে না। কৃমি পরিত্যক্ত নাড়া, খড়কুটো এবং ঘাসে এমনকি মাটিতে কুন্ডলী পাকিয়ে বেঁচে থাকে।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• রোগ দেখা দিলে হেক্টরপ্রতি ২০ কেজি হারে ফুরাডান ৫জি অথবা কিউরেটার ৫জি প্রয়োগ করুন।

• রোগাক্রান্ত জমির ফসল কাটার পর নাড়া পুড়িয়ে ফেলুন।

• সম্ভব হলে জমি চাষ দিয়ে ১৫-২০ দিন ফেলে রাখুন।

• আক্রান্ত জমিতে বীজতলা করা উচিৎ নয়।

• ধানের পর ধান আবাদ না করে অন্য ফসলের চাষ করুন।

• জলী আমন ধানে আক্রান্ত জমিতে কারবেনডাজিম ২% হারে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়।

*(৪) ব্লাস্ট (Blast):

ব্লাস্ট ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ পাতায় হলে পাতা ব্লাস্ট, গিটে হলে গিট ব্লাস্ট ও শিষে হলে শিষ ব্লাস্ট বলা হয়। পাতায় ব্লাস্ট হলে পাতায় ছোট ছোট ডিম্বাকৃতির দাগের সৃষ্টি হয়। আস্তে আস্তে দাগ বড় হয়ে দু’প্রান্ত লম্বা হয়ে চোখের আকৃতি ধারন করে। দাগের চার ধারে বাদামি ও মাঝের অংশ সাদা বা ছাই বর্ণ ধারন করে। অনেকগুলো দাগ একত্রে মিশে গিয়ে পুরো পাতা মরে যায়। এ রোগের কারণে জমির সমস্ত ধান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ রোগ বোরো মৌসুমে বেশি হয়। গিট ব্লাষ্ট এবং শিষ ব্লাষ্ট হলে গিট ও শিষের গোড়া কালো হয়ে যায় ও ভেঙ্গে পড়ে এবং ধান চিটা হয়ে যায়। রাতে ঠান্ডা, দিনে গরম, রাতে শিশির পড়া এবং সকালে কুয়াশা থাকলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• জমিতে জৈব সার প্রয়োগ করুন ।

• জমিতে পানি ধরে রাখুন।

• রোগমুক্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করুন।

• সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করুন । আক্রান্ত জমিতে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সাময়িক বন্ধ রেখে প্রতি হেক্টরে ৪০০ গ্রাম ট্রপার, জিল বা নেটিভো ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে দু’বার প্রয়োগ করুন।

• সকল সুগন্ধি ধান, হাইব্র্রিড ধান এবং লবণ-সহনশীল ধানে ফুল আসার সময় নিম্নচাপ দেখা দিলে উল্লিখিত ছত্রাকনাশক আগাম স্প্রে করতে হবে।

*(৫) খোলপোড়া (Sheath blight):

খোলপোড়া ছত্রাকজনিত রোগ। ধান গাছের কুশি গজানোর সময় হতে রোগটি দেখা যায়। প্রথমে খোলে ধূসর জলছাপের মত দাগ পড়ে। দাগের মাঝখানে ধূসর হয় এবং কিনারা বাদামি রঙের রেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। দাগ আস্তে আস্তে বড় হয়ে সমস্ত খোলে ও পাতায় অনকেটা গোখরো সাপের চামড়ার মত চক্কর দেখা যায়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, বেশি মাত্রায় ইউরিয়ার ব্যবহার ও ঘন করে চারা রোপন এ রোগ বিস্তারে সহায়তা করে।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• জমিতে শেষ মই দেয়ার পর পানিতে ভাসমান আবর্জনা সুতি কাপড় দিয়ে তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলুন।

• পটাশ সার সমান দু’কিস্তিতে ভাগ করে এক ভাগ জমি তৈরির শেষ চাষে এবং অন্য ভাগ শেষ কিস্তি ইউরিয়া সার প্রয়োগের সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করুন।

• নেটিভো, ফলিকুর, কনটাফ, হেক্সাকোনাজল খোলপোড়া রোগ দমনে কার্যকর ছত্রাকনাশক। আক্রান্ত ধানগাছের চারপাশের কয়েকটি সুস্থ গুছিসহ বিকেলে গাছের উপরিভাগে এটি স্প্রে করুন। ছত্রাকনাশকের মাত্রা লেবেলে দেখে নিন।

• সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করুন।

*(৬) বাকানি (Bakanae):

এটি ছত্রাকজনিত রোগ। আক্রান্ত কুশি দ্রুত বেড়ে অন্য গাছের তুলনায় লম্বা ও লিকলিকে হয়ে যায় এবং হালকা সবুজ রঙের হয়। গাছের গোড়ার দিকে পানির উপরের গিঁট থেকে শিকড় বের হয়। ধীরে ধীরে আক্রান্ত গাছ মরে যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• রোগাক্রান্ত কুশি তুলে ফেলুন।

• এ রোগ বীজবাহিত। তাই বীজ শোধন করতে পারলে ভাল হয়। এ জন্য কারবেনডাজিম গ্রুপের যেকোন ছত্রাকনাশকের ৩ গ্রাম ওষুধ ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে অঙ্কুরিত বীজে স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। তাছাড়া একই পরিমান ওষুধ দিয়ে সারা রাত চারা শোধন করেও ভাল ফল পাওয়া যায়।

*(৭) বাদামি দাগ (Brown spot):

এটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ হলে পাতায় প্রথমে ছোট ছোট বাদামি দাগ দেখা যায়। দাগের মাঝখানটা হালকা বাদামি রঙের হয়। অনেক সময় দাগের চারদিকে হলুদ আভা দেখা যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• জমিতে জৈব সার প্রয়োগ করুন।

• ইউরিয়া ও পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করুন।

• সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করুন।

• পর্যায়ক্রমে জমিতে পানি সেচ দিন এবং জমি শুকিয়ে নিন।

• আক্রান্ত জমিতে শিষ বের হওয়ার পর ৬০ গ্রাম পটাশ ও ৬০ গ্রাম থিওভিট/কমুলাস ১০লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫শতক জমিতে স্প্রে করলে ধানে বাদামি দাগ কম হয়।

• কারবেনডাজিম-জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে (বীজ ০.৩% দ্রবণে ১২ঘন্টা ভিজিয়ে) বীজ শোধন করুন।

*(৮) খোল পচা (Sheath rot):

এটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ ধানগাছের ডিগপাতার খোলে হয়। রোগের শুরুতে ডিগপাতার খোলের উপরের অংশে গোলাকার বা অনিয়মিত আকারের বাদামি দাগ দেখা যায়। আস্তে আস্তে দাগটি বড় হতে থাকে এবং গাঢ় ধূসর রঙ ধারন করে। এ অবস্থায় অনেক সময় শিষ বের হতে পারে না অথবা রোগের প্রকোপ অনুযায়ী আংশিক বের হয় এবং বেশিরভাগ ধান কালো ও চিটা হয়ে যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• আক্রান্ত খড়কুটো জমিতে পুড়িয়ে ফেলুন।

• সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করুন।

• খোলপোড়া রোগের ছত্রাকনাশক এ রোগের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করুন।

*(৯) লক্ষীর গু (False smut):

এটিও ছত্রাকজনিত রোগ। ধান পাকার সময় এ রোগ দেখা যায়। ছত্রাক ধানের বাড়ন্ত চালকে নষ্ট করে বড় গুটিকার সৃষ্টি করে। গুটিকার ভিতরের অংশ হলদে-কমলা রঙ এবং বহিরাবরণ সবুজ যা আস্তে আস্তে কালো হয়ে যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• এ রোগ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল রোগাক্রান্ত শিষ তুলে ফেলা ও মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার না করা।

*(১০) পাতা লালচে রেখা (Bacterial leaf streak):

এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। ব্যাকটেরিয়া পাতার ক্ষত দিয়ে প্রবেশ করে এবং শিরার মধ্যবর্তী স্থানে সরু রেখার জন্ম দেয়। আস্তে আস্তে রেখা বড় হয়ে লালচে রঙ ধারন করে। পাতা সূর্যের বিপরীতে ধরলে দাগের ভিতর দিয়ে স্বচ্ছ আলো দেখা যায়।

ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়ঃ

• এ রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বীজ শোধন করা দরকার, আক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত নয় এবং নাড়া পুড়িয়ে ফেলা দরকার।

ধান ফসল কাটা, মাড়াই ও সংরক্ষণ


• অধিক পাকা অবস্থায় ফসল কাটলে অনেক ধান ঝরে পড়ে, শিষ ভেঙ্গে যায়, শিষকাটা লেদাপোকা এবং পাখির অক্রমণ হতে পারে। শিষের শতকরা ৮০ ভাগ ধানের চাল শক্ত ও স্বচ্ছ হলে ধান ঠিকমতো পেকেছে বলে বিবেচিত হবে। কাটার পর ধান মাঠে ফেলে না রেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মাড়াই করা উচিত। কাঁচা খলার উপর ধান মাড়াই করার সময় চাটাই, চট বা পলিথিন বিছিয়ে নিন। এভাবে ধান মাড়াই করলে ধানের রঙ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকে। মাড়াই করা ধান অন্তত ৪-৫ দিন রোদে ভালভাবে শুকানোর পর যেন বীজের আর্দ্রতা শতকরা ১২ ভাগের নিচে থাকে এবং এমতাবস্থায় গুদামজাত ও আর্দ্রতা-রোধক গুদামে সংরক্ষণ করতে হবে।